যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ শতাংশ আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণায় উদ্বেগ বাড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে। বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, অতিরিক্ত এই শুল্কের প্রভাবে পোশাকের দাম বৃদ্ধি পাবে, যা চাহিদা কমাতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মূলত ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকেরা।
এত দিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল। এখন নতুন করে ৩৭ শতাংশ শুল্ক যোগ হওয়ায় মোট কর দাঁড়াবে প্রায় ৫২ শতাংশে। এই সিদ্ধান্ত রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রমুখী, যার একটি বড় অংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৭২০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে, যা দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ১৯ শতাংশ। অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে জুতা, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও টেক্সটাইল সামগ্রী।
আশঙ্কা ও সম্ভাবনা:
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করছেন, এটি আপাতত একটি “ধাক্কা” হলেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি নয়। কারণ, এই শুল্ক আরোপ ভারতের মতো কিছু প্রতিযোগী দেশ বাদে প্রায় সবার ওপরই হয়েছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও জিডিপির নিম্নগতি বিবেচনায় মৌলিক ও সাশ্রয়ী পণ্যের চাহিদা কমবে না—যেখানে বাংলাদেশের পণ্য এখনও প্রতিযোগিতামূলক থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, তারা বাংলাদেশি পণ্যে ৭৪ শতাংশ শুল্ক দেয়, যেখানে বাংলাদেশের আমদানি পণ্যগুলোর একটি বড় অংশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায়। এই বৈষম্য তুলে ধরে কৌশলগত আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন বাজারে রপ্তানিকারক সুবিধা পুনরুদ্ধার সম্ভব হতে পারে।
বাণিজ্য নেতাদের মতামত:
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, এই শুল্ক কাঠামো বলবৎ থাকলে ভারত ও পাকিস্তানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পোশাক ক্রয়াদেশ চলে যেতে পারে। বিশেষ করে ডেনিম, হেভি জার্সি, ও হোম টেক্সটাইলের বাজার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, হঠাৎ করে শুল্ক বাড়ানোয় বড় ধাক্কা লাগলেও কৌশলগত আলোচনার মাধ্যমে কিছু সুবিধা আদায় করা সম্ভব। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ যে ২০ বিলিয়ন ডলারের মতো পণ্য আমদানি করে তার প্রায় অর্ধেকই শুল্কমুক্ত উল্লেখ করে বলেন, “এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে পারি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ভারসাম্য আনার চেষ্টা করতে পারি।”
পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা:
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৮৫০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে প্রায় ২২০ কোটি ডলারের পণ্য, যার মধ্যে রয়েছে সয়াবিন, তুলা, খাদ্যশস্য ও যন্ত্রপাতি।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—কীভাবে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো যায় এবং দেশের পোশাক খাতকে সুরক্ষিত রাখা যায়।
মন্তব্য করুন