দেশে ট্রাভেল এজেন্সি খাতকে নিয়মের মধ্যে আনতে প্রথমবারের মতো একটি পরিপত্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। তবে প্রস্তাবিত এই পরিপত্রের একটি ধারা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
খসড়া পরিপত্রে বলা হয়েছে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি ট্রাভেল এজেন্সি আরেকটি লাইসেন্সধারী ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে এয়ার টিকিট ক্রয় বা বিক্রয় করতে পারবে না। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এর মাধ্যমে গ্রাহক হয়রানি রোধ ও ব্যবসায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, এই নিয়ম বাস্তবায়িত হলে দেশের হাজার হাজার ট্রাভেল এজেন্সি বন্ধ হয়ে যাবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ হাজার ৭০০টি ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৯৭০টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আয়াটা) স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। বড় এয়ারলাইন্সগুলোর টিকিট বিক্রির অনুমতি (ক্যাপিং) আছে মাত্র ৩৫০টি এজেন্সির হাতে। বাকিরা তাদের কাছ থেকেই টিকিট সংগ্রহ করে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে।
‘বি-টু-বি’ মডেলে ব্যবসা ব্যাহত হবে
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বিশ্বজুড়ে ট্রাভেল ব্যবসায় ‘এজেন্ট টু এজেন্ট’ বা বি-টু-বি মডেল চালু রয়েছে। বাংলাদেশে এটি নিষিদ্ধ করা হলে এই খাত আন্তর্জাতিক মানে পিছিয়ে পড়বে এবং আঞ্চলিক বৈষম্যও বাড়বে।
আটাবের (অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ) মহাসচিব আফসিয়া জান্নাত সালেহ বলেন, “যদি এই নিয়ম বাস্তবায়ন হয়, তাহলে আয়াটা এজেন্ট ছাড়া কেউ টিকিট বিক্রি করতে পারবে না। দেশের বেশিরভাগ ছোট ও মাঝারি এজেন্সি আয়াটার সদস্য হতে পারবে না। ফলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।”
আয়াটার সদস্য হতে কেন এত জটিলতা?
আয়াটার সদস্য হতে হলে একটি এজেন্সিকে অন্তত ছয় মাস ব্যবসা করতে হয় এবং ন্যূনতম ৩০ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টিসহ নানা ডকুমেন্ট জমা দিতে হয়। এরপরও সব এয়ারলাইনসের টিকিট পাওয়ার অনুমতি মেলে না। সদস্য হলে সেই গ্যারান্টির ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ ২১ লাখ টাকার টিকিট কিনতে পারার সীমাবদ্ধতাও থাকে।
মঈন ট্রাভেলসের মালিক মো. গোফরান চৌধুরী জানান, ২০২5 সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তিনি নিজে মাত্র ৮টি টিকিট ইস্যু করতে পেরেছেন। বাকি সব টিকিট অন্য এজেন্সি থেকে সংগ্রহ করতে হয়েছে। তার মতে, খসড়া পরিপত্র বাস্তবায়িত হলে তাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের আর টিকে থাকার সুযোগ থাকবে না।
আঞ্চলিক বৈষম্যের শঙ্কা
বর্তমানে আয়াটা স্বীকৃত এজেন্সিগুলো ঢাকাসহ মাত্র কয়েকটি শহরে সীমাবদ্ধ। দেশের অন্য জেলা ও অঞ্চলে কার্যত একমাত্র ভরসা বি-টু-বি মডেল। সেটি বন্ধ হলে এসব অঞ্চলের যাত্রীরা ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়বেন।
পরিপত্র নিয়ে মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খসড়া পরিপত্র নিয়ে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে, তবে এখনো তা চূড়ান্ত নয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পর্যটন) ফাতেমা রহিম ভীনা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, এমন পরিপত্র বাস্তবায়িত হলে বড় ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর হাতে বাজার চলে যাবে। ছোট ও মাঝারি এজেন্সিগুলো হারিয়ে যাবে প্রতিযোগিতা থেকে। এতে করে দেশে একচেটিয়া ব্যবসার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং বিদেশি এজেন্সিগুলোর দখলদারিত্ব বাড়তে পারে।
মন্তব্য করুন