স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাব ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের শেষে এসব হিসাবের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১২০ কোটি টাকা বা ২.৬১ শতাংশ বেশি।
ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ও প্রবৃদ্ধি
২০২৩ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ৪ দশমিক ২২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৮১ লাখ ২৩ হাজার ৩৯০টি। বিশেষ করে কৃষক ও তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা যথাক্রমে ২৮ হাজার ও ৯৭ হাজার বেড়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ১৭ দশমিক ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
কৃষক ও শ্রমিকদের সঞ্চয়ে ঊর্ধ্বগতি
কৃষকদের ক্ষেত্রে ২০২৩ সালে গড় সঞ্চয় ছিল ৫৭২ টাকা, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৭০৩ টাকায় উন্নীত হয়েছে, অর্থাৎ ২২.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তৈরি পোশাকশ্রমিকদের গড় সঞ্চয় ১৮.২১ শতাংশ বেড়ে ৩,৫৪৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠছে।
মাশুলবিহীন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রভাব
মাশুলবিহীন ব্যাংক হিসাব, যা “নো ফ্রিল অ্যাকাউন্ট” নামে পরিচিত, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বড় ভূমিকা পালন করছে। ২০১০ সালে এই বিশেষ সুবিধা চালুর পর থেকে এসব অ্যাকাউন্ট সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনতে সহায়তা করেছে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ এ ধরনের অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্সের স্থিতি ছিল ৭৭২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ৬.১৬ শতাংশ বেশি।
কৃষক ও শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের গুরুত্ব
২০২৪ সালে কৃষকের মাশুলবিহীন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ ৯০ হাজার ৭৯৩টি। তৈরি পোশাকশ্রমিকদের অ্যাকাউন্ট বেড়ে ১০ লাখ ৩৬ হাজার ৬৮৫টিতে পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধি থেকে বোঝা যায় যে কৃষক ও শ্রমিকরা ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত হতে আগ্রহী।
সঞ্চয়ে শীর্ষ ব্যাংকগুলো
স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাব খোলায় সবচেয়ে জনপ্রিয় সোনালী ব্যাংক, যেখানে মোট হিসাবের ২৪ শতাংশ রয়েছে। তবে সঞ্চয়ে অগ্রণী ব্যাংক শীর্ষে রয়েছে। শীর্ষ পাঁচটি ব্যাংক, যার মধ্যে সোনালী, অগ্রণী, ব্যাংক এশিয়া, ইসলামী ব্যাংক, এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত, নো ফ্রিল অ্যাকাউন্টের প্রায় ৭৯ শতাংশ পরিচালনা করছে।
সংকট কাটিয়ে আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা
২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের পর অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে। ফলে কৃষক ও শ্রমিকদের সঞ্চয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
কৃষক ও তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব ও সঞ্চয়ের এই প্রবৃদ্ধি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং দেশের অর্থনীতিতে স্বল্প আয়ের মানুষের ভূমিকা আরও দৃঢ় করবে।